বিত্তশালী সেই মায়ের করুণ কাহিনি

সহায় সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর রাজধানীর ৬০ ফিটে রাস্তায় ফেলে রাখা ৮০ বছর বয়সী আমেনা খাতুন এখন সুস্থ আছেন। নামাজ-কালাম পড়েই কাটছে তার সময়। বর্তমানে তিনি রাজধানীর কল্যাণপুরের পাইকপাড়ার চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড কেয়ারে আছেন।

গত ৩১ অক্টোবর সারাদিন মিরপুরের ৬০ ফুট সড়কের পাশে পড়েছিলেন এই বৃদ্ধা। স্থানীয় দুই নারী তাকে উদ্ধার করে প্রথমে আগারগাঁও প্রবীণ হিতৈষী সংঘে নিয়ে যান। সেখানে পরিচয়হীন কাউকে রাখা হয় না জানিয়ে দিলে তারা শেরেবাংলানগর থানায় যান। থানাও জানিয়ে দেয় তাদের কিছু করার নেই। পরে হাসিবুল হাসিম নামে এক ব্যক্তি তাকে ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারে’ নিয়ে যান।

চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড কেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা মিল্টন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বৃদ্ধা মায়ের শারীরিক অবস্থা এখন অনেক ভালো। তিনি এখন ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া করছেন। তার ইচ্ছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এখানেই থাকবেন। আশপাশে যারা আছে তাদের খেদমতে তিনি ভীষণ খুশি। লালমাটিয়ায় তার বাড়ি আছে। ব্যাংকে ডিপোজিট করা টাকা আছে। এর বাইরে তেমন কিছু তিনি বলতে চান না। আর পরিবার ও ছেলেদের নিয়ে আমরা বেশি প্রশ্ন করি না। কারণ এতে তিনি কষ্ট পান।’

মিল্টন বলেন, ওই বৃদ্ধা তাদের জানিয়েছে প্রতিনিয়ত তাকে মারধর করা হতো। যেদিন তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় ওইদিন উলঙ্গ করে তাকে রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল। এর আগে তাকে ভীষণ মারধর করা হয়। বাথরুমে নিয়ে পানি ঢেলে দেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে বের করে রাস্তায় ফেলে যাওয়া হয়। কারা এটা করেছে জানতে চাইলে ওই বৃদ্ধা জানিয়েছেন, তিনি মূলত আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে থাকতেন। বাড়ির কেয়ারটেকার তাকে দেখাশোনা করতেন। ছেলেদের কাছে তিনি থাকতেন না। দেশে এক ছেলে আছেন, রাজধানীর উত্তরায় থাকেন। তার নাম আব্দুল্লাহ। প্রায়ই এই বৃদ্ধা ছেলেকে গালিগালাজ করেন।

মিল্টন আরও বলেন, তার ছেলেরা হয়ত এখন অবস্থা ঘোলাটে দেখে তাকে নিতে আসছেন না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা হয়ত নিতে আসবে। তিনি বলেন, আমি যতটুকু বৃদ্ধার কাছ থেকে জানতে পেরেছি তার ছেলে আব্দুল্লাহর বাড়ি আছে উত্তরায়। তিনি এখন সারাদিন কোরআন ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। তিনি খুবই ধার্মিক। আমরা তার জন্য নতুন কাপড়-চোপড় কিনে দিয়েছি।

চাইল্ড কেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা বলেন, তার রুমে যারা আছে তাদের তিনি কাছে ডাকেন, গল্প বলেন। এই বয়সে যা হয় একজন মানুষের। আমাদের এখানে যেসব স্টাফ আছে তারা কাজ শেষ করে এসে উনার সঙ্গে গল্প করেন।

মিল্টন বলেন, তিনি বর্তমানে আমাদের এখানে তিন নম্বর রুমে আছেন। সেখানে পরিবার থেকে রাস্তায় ফেলে যাওয়া লালা আন্টি, আলো তারা আন্টি, জেসমিন আক্তার আন্টি মিলে থাকেন। সবার সাথে তার বেশ ভাব জমে গেছে। এই রুম পরিবর্তন করে তাকে অন্য রুমে দিতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি অন্য রুমে যেতে ইচ্ছুক না। কারণ এই তিনজন নারীর মধ্যে একজন কথা বলতে পারেন না। আর বাকি দুইজন অসুস্থ। অন্য রুমে নিতে চাইলে তিনি বলেন, আমি অন্য রুমে গেরে এদের তিনজনকে দেখবে কে?

ছবি তুলতে গেলে বা অন্য ছেলেরা তার রুমে এলে তিনি খুব বিরক্ত হন। আমরা তাকে আনন্দের মধ্যে রাখতে মাঝে মাঝে বিভিন্ন গল্প শোনাই। কেউ গালে হাত দিলে তিনি রেগে যান।

আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রথম দিকে যারা তাকে নিতে এসেছিল তারা আর আসেনি। তবে তার স্ত্রীর নম্বরে দুদক দিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছিল বৃদ্ধার স্বজনরা এমন অভিযোগ করেন মিল্টন।