স্বামীকে খুন করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ছদ্মবেশে সংসার!

তিন বছর আগে পুরান ঢাকার ইংলিশ রোডে ছুরিকাঘাতে খুন হন রুবেল বেপারী। তিনি ছিলেন মুন্সীগঞ্জ-গুলিস্তান রুটে গাংচিল পরিবহনের বাসচালক। রুবেল বেপারী খুনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের ধারণা ছিল ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতেই তার মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ওয়ারী থানায় হত্যা মামলা হয়। কিন্তু দীর্ঘ তদন্তেও শনাক্ত হয়নি ঘাতক। পরে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর হয়।

সিআইডিও বেশ কিছু দিন ধরে মামলাটি তদন্ত করে। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে তিন বছর। অবশেষে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘাতকের সন্ধান পায় সিআইডি।

সিআইডির পুলিশ কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন ২ মার্চ রাতে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থানা বাজারের অলির বাড়ি থেকে রুবেল বেপারীর ঘাতক টিপু বেপারীকে গ্রেফতার করেন। ওই বাড়িতে সে রুবেল বেপারীর স্ত্রী লিমা আক্তার কাকলী ও মেয়েকে নিয়ে সংসার করছিল। এরই মধ্যে লিমার গর্ভে টিপু বেপারীর একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়েছে।

গ্রেফতারের পর টিপু বেপারীকে সোমবার আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চায় সিআইডি। আদালত তার দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে বুধবার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণের পর আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।

টিপু বেপারী আদালতে দেয়া জবানবন্দি ও সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল বেপারীকে হত্যার পর ছদ্মবেশে তার স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে তিন বছর সংসার করার চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে।

টিপু বেপারী জানায়, রুবেল বেপারী ও সে একই মায়ের সন্তান। তবে তাদের বাবা দু’জন। তাদের বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি থানার করকিরচরে। রুবেল বেপারীর বাবা মারা যাওয়ার পর হায়দার আলী বেপারীর সঙ্গে তার মায়ের বিয়ে হয়। হায়দার আলী বেপারীর ঘরে টিপু বেপারী ছাড়াও তার আরও এক ভাই একবোন রয়েছে। তাদের সঙ্গেই থাকতেন রুবেল বেপারী ও তার আরেক ভাই। তারা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের গোলামবাজার বন্ডবপাড়া মমিন হাজীর বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। রুবেল বেপারী গাংচিল পরিবহনের একটি গাড়ি চালাতেন।

২০১৪ সালে রুবেল বিয়ে করেন। স্ত্রীকে নিয়ে মুন্সীগঞ্জের বালিগাঁও এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন। এদিকে সৎ ভাই টিপু বেপারী মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজসহ বিভিন্ন হাতের কাজ জানত। কিন্তু কাজে না গিয়ে সে এলাকায় আড্ডাবাজি করত। এ কারণে রুবেল বেপারী মুন্সীগঞ্জে একটি মোবাইল এক্সেসরিজের দোকান দিয়ে দেন টিপু বেপারীকে। থাকতে দেন নিজের বাসায়। রুবেল বেপারী সকালে বাসা থেকে বের হন, ফেরেন গভীর রাতে। এ সুবাদে টিপু বেপারী রুবেল বেপারীর স্ত্রী লিমা আক্তার কাকলীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। তাদের সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আশপাশের লোকজনের মাঝে কানাঘুষা শুরু হয়। এরই মধ্যে রুবেল বেপারীর ঘরে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান।

একদিন রুবেল বেপারী স্ত্রী লিমা আক্তার কাকলী ও ভাই টিপু বেপারীকে অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে শাসন করেন। এ নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। রুবেল বেপারী বাসা থেকে ডিউটিতে বের হলে টিপু বেপারী ভাবি ও তার সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে লৌহজংয়ের নওয়াপাড়া এলাকায় থাকতে থাকেন। ফোন করে রুবেল বেপারী তার সন্তানকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য চাপ দিলেও টিপু বেপারী সন্তান ফেরত দিচ্ছিল না।

২০১৬ সালের ১৮ মে দুপুর ১২টার দিকে টিপু বেপারী গুলিস্তানে মোবাইল এক্সেসরিজের মালামাল কিনতে আসেন। সেখানে দেখা হয়ে যায় রুবেল বেপারীর সঙ্গে। এ সময় রুবেল বেপারী তার মেয়েকে ফেরত চান। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে টিপুকে বাসের চাকায় পিষে মারার হুমকি দেন রুবেল। এতে ক্ষুব্ধ হয় টিপু বেপারী। পরে ইংলিশ রোডের মাথায় একটি দোকান থেকে ৫০ টাকা দিয়ে একটি ছোরা কেনে সে। রুবেল বেপারী তখনও ওই এলাকায় অবস্থান করছিলেন। ওইদিন দুপুর দেড়টার দিকে গাড়ির একটি পার্টস কেনার জন্য ইংলিশ রোড থেকে ধোলাইখাল যাওয়ার জন্য একটি রিকশায় উঠছিলেন রুবেল বেপারী। ঠিক এমন সময় পেছন থেকে তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় টিপু বেপারী। আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মিটফোর্ড ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখান থেকে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে মারা যান রুবেল বেপারী।

এ ঘটনায় তার বাবা হায়দার বেপারী বাদি হয়ে ওই বছরের ২০ মে ওয়ারী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। হায়দার বেপারীও জানতেন না, রুবেল বেপারীর খুনি তার ছেলে টিপু।

এদিকে আগে থেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না টিপু বেপারীর। রুবেল বেপারীকে হত্যার পর লৌহজং থেকে টিপু বেপারী লিমা আক্তার কাকলী ও তার মেয়েকে নিয়ে চলে যান সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে। সঙ্গে শিশু থাকার কারণে তারা সেখানে বাসা ভাড়াও পেয়ে যান।

টিপু বেপারী জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে সিলেটে গিয়ে ফাহিম সুলতান নাম ধারণ করেছিল সে। সেখানে লিমা আক্তার কাকলীর সঙ্গে তিন বছর সংসার করে। রুবেল বেপারীর কন্যা সন্তান ছাড়াও তাদের একটি ছেলেসন্তান রয়েছে। টিপু বেপারীর দাবি, কাজী অফিসে তাদের বিয়ে হয়।

সিআইডির ঢাকা মেট্রো অঞ্চলের ডেমরা জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন বলেন, আমরা রিমান্ডে এনে টিপু বেপারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। সে রুবেল বেপারী হত্যার দায় স্বীকার করে বিস্তারিত জানিয়েছে।

তিনি বলেন, টিপু বেপারী এতটাই দুরন্ধর যে, সে গ্রেফতার এড়াতে নিজের নাম পাল্টেছিল। আমরা যখন তাকে গ্রেফতার করতে গেলাম, তখন এলাকার মানুষও তাকে টিপু বেপারী নামে জানত না। সবাই চিনত ফাহিম সুলতান নামে। সে যে মোবাইল সিমটি ব্যবহার করত, সেটিও অন্য একজনের নামে নিবন্ধন করা ছিল।