বিয়ে, বাসর এবং টেনশন ‘ভাই কি ব্যস্ত?’

‘ভাই কি ব্যস্ত?’ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ফরহাদ সাহেব প্রশ্ন করলেন।জি। একটু ব্যস্ত আছি। কেন?

: ভাই, একটা জরুরি বিষয়ে আপনার পরামর্শ দরকার।

: ফরহাদ সাহেব, যদি কিছু মনে না করেন, আমি আপনাকে একটু পরে ফোন দিই? আসলে আমার এক আত্মীয় গুরুতর অসুস্থ। তাকে দেখতে হাসপাতালে এসেছি।

: ভাই, আমার বিষয়টিও খুব জরুরি। জটিল সমস্যা।

: আচ্ছা বলেন।

বিরক্তি লুকিয়ে বললাম।

: ভাই আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। এটা নিয়ে ভীষণ টেনশনে আছি।

: বিয়ে তো খুশির বিষয়। এটা নিয়ে টেনশন কেন?

: কী বলেন ভাই, টেনশন করব না! বিয়ের পর বাসররাতে বউয়ের সাথে কীভাবে কথা শুরু করব, আর কী বিষয় নিয়ে কথা বলব ঠিকই করতে পারছি না।

মনে হলো কষে একটা থাপ্পড় দিই। ব্যাটা ফাজিল, আমি আসছি রোগী দেখতে আর তুই আছস তোর বাসররাত নিয়ে। অন্য কেউ হলে দুটো কড়া কথা শুনিয়ে লাইন কেটে দিতাম। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা করলাম না। কারণ, ছেলেটিকে আমি যথেষ্ট পছন্দ করি। আমার অফিসেই কাজ করে, আমার জুনিয়র। বয়সে সম্ভবত আমারই সমান হবে। সহজ–সরল একটা ছেলে। তার যেকোনো সমস্যায় সে সাধারণত আমার কাছেই পরামর্শের জন্য ছুটে আসে।

: ফরহাদ সাহেব, আপনি কি এখন বাসরঘরে?

: না ভাই, বাসরঘরে থাকব কেন! আমার বিয়ে তো আগামী মাসে।

: ভাইরে, তাহলে এটা নিয়ে এখন এত টেনশন করছেন কেন?

: কী বলেন ভাই, টেনশন করব না? এটা আমার প্রথম বিয়ে। আর তা ছাড়া আমার তো বাসররাতের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতাও নেই।

: আপনার কি ধারণা আমরা যারা বিয়ে করেছি, তাদের আগে থেকেই বাসররাতের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল।

: সেটা আমি কী করে বলব। ভাই, আমার হেল্প দরকার।

এ ছেলেকে কিছু বলে লাভ নেই। নাছোড়বান্দা টাইপের ছেলে। কাণ্ডজ্ঞানের যথেষ্ট অভাব আছে। না হলে হাসপাতালে রোগী দেখতে আসা একজন মানুষের সঙ্গে কেউ কি বাসররাতে কী করবে তা নিয়ে আলোচনা করে?

: ফরহাদ সাহেব, আপনাকে ভালো একটা বুদ্ধি দিই। এক কাজ করুন, আপনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘বাসররাতের কথোপকথনের ১০১টি উপায়’ বইটি কিনে আনুন। আপনার সব প্রশ্নের উত্তর ওখানে পেয়ে যাবেন।

: ধন্যবাদ ভাই। আমি জানতাম আমার সমস্যার সমাধান আপনাকে দিয়েই হবে।

কথাটি বলে আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই ফরহাদ সাহেব লাইনটা কেটে দিলেন।

গভীর নিস্তব্ধ রাত। ঘরের সবাই ঘুমাচ্ছে। এ সময় পুরো ঘর কাঁপিয়ে ফোনটা বেজে উঠল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘুমের মধ্যে ফোন ধরলাম। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ফরহাদ সাহেবের হতাশ কণ্ঠ ভেসে এল।

: ভাই, বইটা তো কোথাও খুঁজে পেলাম না।

: আপনি কোন বইয়ের কথা বলছেন?

ঘুমজড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম।

: কেন ভাই, ভুলে গেলেন? আপনি না বললেন রবীন্দ্রনাথের বাসররাতের বইটা কেনার জন্য। আপনি বলার পর সেই সন্ধ্যা থেকে নীলক্ষেত, বাংলাবাজার সব জায়গায় খুঁজেছি। বাসায় ফিরে ইন্টারনেটে সার্চ করেছি, কোথাও পাইনি। ভাই, এখন কী করব?

আমি বুঝতে পারছি না, একটা শিক্ষিত মানুষ কীভাবে এতটা বলদ হয়! এ তো দেখি ফানও বোঝে না। রবীন্দ্রনাথের বইয়ের কথা বলেছিলাম ফান করে কিন্তু এ পাবলিক যে ঢাকা শহরজুড়ে এই বই খুঁজবে, আমার ধারণাতেই আসেনি। দুটো কড়া কথা শোনানো দরকার। কিন্তু মাঝরাতে কথা বাড়িয়ে নিজের ঘুম নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। তাই মিথ্যা করে বললাম, সমস্যা নেই। বইটা আমার কাছে আছে। আমি কাল অফিসে আসার সময় নিয়ে আসব।

পরদিন সকালে অফিসে এসে মাত্র চেয়ারে বসেছি, জানি না ফরহাদ সাহেব কোথা থেকে উড়ে এসে সামনে দাঁড়ালেন।

: ভাই, দেন।

: দেন মানে! কী দেব?

: বই দেবেন। কেন, আনেননি?

: ও, বই। আচ্ছা আগে বসেন, একটু কথা বলি।

ফরহাদ সাহেব বসলেন না। উনি দাঁড়িয়ে রইলেন। আসলে উনি কখনোই আমার সামনে চেয়ারে বসেন না। সিনিয়রদের প্রতি এই ধরনের সম্মান প্রদর্শন আজকাল খুব একটা দেখা যায় না।

: ফরহাদ সাহেব, আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিন তো। আপনি বিয়ে আর বাসররাত নিয়ে এত টেনশন করছেন কেন?

: এটা কী বললেন ভাই। টেনশন করব না! বিরাট সমস্যার মধ্যে আছি। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে টেনশনে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছি না।

: টেনশনের কারণ কী, সেটাই তো জানতে চাচ্ছি।

: ভাই, এ জীবনে কোনো মেয়ের সঙ্গেই তেমন একটা মিশিনি। পড়ালেখা করেছি বয়েজ স্কুলে। যার সঙ্গে বিয়ে তাকে শুধু একবারই দেখেছি। আমাদের দুজনকে একটি রুমে বসিয়ে দিয়েছিল কথা বলার জন্য। কিন্তু লজ্জায় একটা কথাও বলতে পারিনি। এখন সে মেয়ের সঙ্গে সারা রাত কীভাবে থাকব? কী কথা বলব? একেবারে মাথা খারাপ হওয়ার মতো অবস্থা। ভাই, আমি অনেক ভেবেছি, কোনো টপিক খুঁজে পাচ্ছি না। এখন আপনি বইটি দিলে একটু প্রস্তুতি নিতাম।

: ফরহাদ সাহেব, সরি, আমি আপনার সঙ্গে একটু মজা করেছিলাম। আসলে এ ধরনের কোনো বই–ই নেই।

: ভাই, এটা কী বললেন।

: আসলে আমি ভেবেছিলাম আপনি আমার ফানটা ধরতে পারবেন। আচ্ছা আপনি কীভাবে ভাবলেন, রবীন্দ্রনাথের মতো একজন মানুষ এ–জাতীয় সস্তা একটা বই লিখবেন।

: ভাই, আমি তো জানি উনি সবকিছু নিয়েই লিখেছেন। কোনো বিষয় বাদ দেননি। তাই ভাবলাম বাসররাতের বইও থাকতে পারে। তাহলে এখন কী করব?

: শোনেন, এখানে টেনশনের কিছু নেই। উনি আপনার স্ত্রী। আপনার যা ইচ্ছে হয় তাই নিয়ে ওনার সঙ্গে কথা বলবেন।

: যেমন…একটু যদি খুলে বলতেন।

: আরে ভাই, স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে সব ধরনের কথা হবে। সেটা কীভাবে খুলে বলব!

: মানে আমি বলতে চাচ্ছি, কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, তার যদি কয়েকটি উদাহরণ দিতেন।

ভেতরে ভেতরে রেগে গেলেও সেটা গোপন করে বললাম, আপনি উদাহরণ চাচ্ছেন? আচ্ছা, উদাহরণ দিচ্ছি। যেমন সেটা হতে পারে নির্বাচনে হিলারির পরাজয়ের কারণ, হতে পারে পচা সাবানের নাম কেন পচা সাবান অথবা এ বছরের বাজেটের ভালো দিক, মন্দ দিক ইত্যাদি।

যদিও টিটকারির সুরে কথাগুলো বললাম কিন্তু মুখ দেখে মনে হলো না টিটকারিটা ধরতে পেরেছেন। বরং খেয়াল করলাম, ওনার চোখে–মুখে একটা খুশি খুশি ভাব ফুটে উঠেছে। ফরহাদ সাহেব আর কোনো কথা না বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।

এর পরের চার দিন উনি আর অফিসে আসেননি। খোঁজ নিয়ে জানলাম, উনি ছুটি নিয়েছেন। হতে পারে বিয়ের কেনাকাটায় ব্যস্ত। চার দিন পর অফিসে ঢুকেই সরাসরি আমার রুমে এলেন। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। চোখ–মুখ দেখে মনে হলো কয়েক রাত ঠিকমতো ঘুমাননি। রুমে ঢুকেই টেবিলের ওপর তিনটি ফাইল রাখলেন।

জিজ্ঞেস করলাম, ফরহাদ সাহেব, এগুলো কী?

: ভাই, দেখলেই বুঝতে পারবেন। গত চার দিন অনেক কষ্ট করে ইন্টারনেট ঘেঁটে, বন্ধুবান্ধবের সাহায্য নিয়ে তৈরি করেছি। এখন একটু কষ্ট করে আপনি ফাইলগুলো দেখে কোনো ভুল থাকলে সংশোধন করে দেন।

চোখে–মুখে বিস্ময় ও আতঙ্ক নিয়ে ফাইলগুলো পাশাপাশি রাখলাম। প্রথম ফাইলের কাভার পেজে লেখা বিষয়: হিলারির পরাজয়ের কারণ, দ্বিতীয়টায় লেথা: পচা সাবানের নাম কেন পচা সাবান আর তৃতীয়টায় লেখা: এ বছরের বাজেটের ভালো দিক, মন্দ দিক। আমি বিস্ময় নিয়ে ফাইলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বুঝতে পারছি না এ বলদ রে কী বলব। আমার তো এখন এর সঙ্গে কথা বলতেই ভয় লাগছে। কারণ যা–ই বলব, এই বলদ সেটাই সিরিয়াসলি নেবে।

: ফরহাদ সাহেব, বসুন, আর আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুন।

: জি ভাই, বলেন। আমি সব কথাই মন দিয়ে শুনি এবং সে অনুযায়ী কাজ করি।

: সেটাই তো সমস্যা। অন্যের কথায় সব কাজ করবেন কেন? অন্যের পরামর্শ নিতে পারেন কিন্তু কাজ করবেন নিজের বুদ্ধিতে। শুনুন, এই সব ফাইলটাইল লাগবে না। আপনি সহজে কীভাবে কথা শুরু করবেন সেটা বলে দিচ্ছি।

: আলহামদুলিল্লাহ। মনে শান্তি পাইলাম। জি ভাই, বলেন।

: শোনেন, প্রথমে ঘরে ঢুকে আপনি আপনার স্ত্রীকে মিষ্টি করে তার নাম জিজ্ঞেস করবেন।

: না ভাই, আমি তার নাম জানি।

: ঠিক আছে, বুঝলাম আপনি তার নাম জানেন। তারপরও জিজ্ঞেস করুন।

: বুঝলাম না, নাম জানার পরও বোকার মতো কেন তার নাম জিজ্ঞেস করব!

: সেটাও ঠিক। কিন্তু আপনি তো তার সঙ্গে কখনো সরাসরি কথা বলেননি। আর তার নাম জেনেছেন অন্যের কাছ থেকে। এখন তার মুখ থেকে যদি তার নাম শুনতে চান, তাতে তো কোনো সমস্যা নেই। আপনাকে তো কিছু একটা দিয়ে কথা শুরু করতে হবে। আচ্ছা বাদ দেন। নাম শুনতে হবে না। তার চেয়ে বরং আপনি আপনার স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাবেন। তারপর বলবেন, তুমি এত সুন্দর কেন? দেখো, তোমার আলোয় আমার পুরোটা ঘর কেমন আলোকিত হয়ে গেছে।

: না ভাই, পুরো ঘর আলোকিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। মেয়ে যথেষ্ট কালো।

: শুনুন গায়ের রং কোনো বিষয় নয়। কালো হোক বা সাদা হোক পৃথিবীর সব মেয়েরাই সুন্দর। আর তা ছাড়া বউকে খুশি করার জন্য একটু মিথ্যা বলা যায়। এটা কোনো ব্যাপার নয়।

: না ভাই, আমি মিথ্যা বলতে পারব না।

: ঠিক আছে, মিথ্যা বলতে হবে না। এক কাজ করুন, বলবেন, এই মেয়ে তুমি কি জানো, গত ৩০টা বছর আমি তোমার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম।

: না ভাই, এটা ডাহা মিথ্যা কথা। আমি এই মেয়েকে আগে কখনো দেখিনি। তাকে আমি চিনিও না। যাকে চিনি না জানি না তার জন্য অপেক্ষা করব কেন?

এ তো দেখি মহা ঝামেলায় পড়লাম। এই বলদ রে আমি এখন কী বলি।

: ভাই, আর একটি কথা, আমার বয়স তো ২৮ বছর। আমি ৩০ বছর কীভাবে তার জন্য অপেক্ষা করব?

: আরে ভাই, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমারে মাফ করেন। আমি বুঝতে পারিনি আপনার বয়স ২৮ বছর। শুনুন, আপনার বয়স যত আপনি তত বলবেন। আমি তো জাস্ট একটা উদাহরণ দিলাম।

রেগে গিয়ে কথাগুলো একটু উচ্চস্বরেই বললাম।

: ভাই, রাগ করছেন কেন?

: না, আমি রাগ করছি না।

: কিন্তু আপনি তো চিৎকার করে কথা বলছেন।

: না, আমি চিৎকার করে কথা বলছি না। আমি উচ্চস্বরে কথা বলছি। এটা এক ধরনের কণ্ঠস্বরের ব্যায়াম। মাঝেমধ্যে এ ব্যায়াম সবার করা উচিত। এতে কণ্ঠস্বর ভালো থাকে। আপনিও চাইলে এ ব্যায়াম করতে পারেন।

এ কথাগুলোও রেগে চিৎকার করে বললাম। কিন্তু এবারও উনি আমার রাগটি ধরতে পারলেন না।

: তা–ই নাকি! তাহলে অবশ্যই চর্চা করব। আসলে আপনি ভাই অনেক জ্ঞানী মানুষ। আপনাকে যতই দেখছি আমি ততই অবাক হচ্ছি।

: তাই? আমিও আপনাকে যতই দেখছি ততই অবাক হচ্ছি। শোনেন ফরহাদ সাহেব, আপনারে সহজ একটা বুদ্ধি দিই। আপনার সত্য–মিথ্যা কিছুই বলার দরকার নেই। ইন ফ্যাক্ট আপনার কোনো কথা বলারই দরকার নেই। কথা বলার জন্য তো সারা জীবনই পড়ে আছে, তা–ই না?

: এটা অবশ্য ঠিক বলছেন। ভাই, তাহলে কি সারা রাত চুপচাপ বসে থাকব?

: না, তা থাকবেন কেন? আপনি বরং আপনার স্ত্রীর হাত ধরে চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকবেন।

: নাউজুবিল্লা। এটা কী বললেন ভাই! আমি তার হাত ধরব কেন?

: নাউজুবিল্লা বলছেন কেন? উনি তো আপনার স্ত্রী। তার হাত ধরতে আপনার সমস্যা কোথায়!

: অবশ্যই সমস্যা আছে। আমি আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ের হাত ধরিনি। এটা বড়ই লজ্জার ব্যাপার।

: আরে ভাই, এটা অন্য কোনো মেয়ে না। এটা আপনার বিবাহিত স্ত্রী। আচ্ছা থাক, লজ্জা লাগলে হাতও ধরার দরকার নেই। আপনি শুধু তার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকাবেন।

: গভীরভাবে তাকাব মানে!

: গভীরভাবে তাকাবেন মানে, গভীরভাবে তাকাবেন।

: ভাই, কিছু মনে করবেন না। আপনি যদি আমার চোখের দিকে একটু তাকিয়ে বুঝিয়ে দিতেন, কীভাবে গভীরভাবে তাকাতে হয়। তাহলে ভালো হতো।

: ভাই রে, আপনিও পুরুষ মানুষ, আমিও পুরুষ মানুষ। আমি আপনার চোখের দিকে কীভাবে গভীরভাবে তাকাব? আমার তো সে আবেগ আসবে না। আচ্ছা বাদ দেন, আপনাকে গভীরভাবে তাকাতে হবে না। আপনি শুধু চোখের দিকে নরমালভাবে সরাসরি তাকিয়ে থাকবেন। অর্থাৎ দুজন দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবেন।

: না ভাই, সেটা সম্ভব না।

: কেন!

: ভাই, আসলে মেয়ের চোখ একটু টেরা আছে। সে যে কোন দিকে তাকিয়ে থাকে, বোঝা যায় না।

আমার এখন প্রচণ্ড ইচ্ছে হচ্ছে ঘুষি মেরে ব্যাটার নাক ফাটিয়ে দিই। অনেক কষ্টে নিজের রাগকে কন্ট্রোল করে বললাম, আপনার বোঝার কোনো দরকার নেই। আপনি শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবেন।

: কিন্তু ভাই, আমি একটা জিনিস বুঝলাম না। আমি খামোখা তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকবই বা কেন?

আমি হতাশ দৃষ্টিতে ফরহাদ সাহেবের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। তারপর বললাম।

: ফরহাদ সাহেব, আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন?

: ভাই, পরামর্শের জন্য এসেছি।

: কিন্তু আপনি তো আমার কোনো পরামর্শই শুনছেন না।

: ঠিক আছে ভাই, আপনি বলেন। আমি অবশ্যই শুনব।

: গুড। আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি তাকিয়ে থাকতে, তাই তাকিয়ে থাকবেন।

: ঠিক আছে ভাই। তাকিয়ে থাকব।

: ভেরি গুড। এখন যান। কাজ করেন আর আমাকেও কাজ করতে দেন, প্লিজ।

: জি ভাই।

বলেই ফরহাদ সাহেব রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু ১০ সেকেন্ড না যেতেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে আবার আমার রুমে ঢুকলেন।

: আবার কী?

ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলাম।

ভাই, একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি।

: কী আপনার সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

: ভাই, আপনি তো বললেন চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে। তা ভাই, কতক্ষণ তাকিয়ে থাকব সেটা তো বললেন না।

ইচ্ছে হচ্ছে বাঁশ দিয়ে বলদটার মাথায় একটা বাড়ি দিই। তারপর বলি, আরে বলদ তোর বিয়ে করার দরকারটাই বা কী। তুই বরং মাঠে গিয়ে ঘাস খা। তোর কাজ হচ্ছে ঘাস খাওয়া আর বসে বসে জাবর কাটা। কিন্তু কেন জানি বলতে পারলাম না। বরং শান্তভাবে কোমল স্বরে বললাম, দরকার হলে সারা রাত তাকিয়ে থাকবেন। সকাল না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকবেন। কোনো সমস্যা?

: না ভাই, কোনো সমস্যা নেই। আপনি যখন বলছেন অবশ্যই সারা রাত তাকিয়ে থাকব।

: ভেরি গুড।

: কিন্তু ভাই, একটা মেয়ে মানুষের চোখের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে হবে ভাবতেই কেমন জানি লজ্জা লাগছে।

: কোনো উপায় নেই ফরহাদ সাহেব। লজ্জা লাগলেও তাকিয়ে থাকবেন।

: জি ভাই। লজ্জা লাগলেও তাকিয়ে থাকব।

ফরহাদ সাহেব আমার রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু একটা কথা মনে হতেই শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এই বলদ ঠিকই বউরে সারা রাত বসিয়ে রেখে শুধু চোখের দিকেই তাকিয়ে থাকবে। বেচারি মেয়েটার জন্য আমার এখন মায়াই লাগছে।

মিনিট দশেক পর ফরহাদ সাহেব আবার আমার রুমে এলেন।

: ফরহাদ সাহেব, আবার কী?

: ভাই, একটা দারুণ আইডিয়া মাথায় এসেছে। এ পদ্ধতিতে বউয়ের চোখের দিকে তাকাতে কোনো লজ্জা লাগবে না।

: তা–ই নাকি! তা পদ্ধতিটা কী?

: জি ভাই, সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাসরঘরে কালো সানগ্লাস পরে ঢুকব। তারপর স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকব। সে বুঝতেই পারবে না আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি।

আমি হাঁ করে গাধাটার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। সে আমার তাকানো দেখে থতমত খেয়ে বলল, ভাই, বুদ্ধিটা ভালো হয়নি?

: ফরহাদ সাহেব, আপনার বিয়েটা জানি কবে?

: ভাই আগামী সপ্তাহে।

: ফরহাদ সাহেব, আপনাকে একটা অনুরোধ করি।

: জি ভাই, করেন।

: আল্লাহর দোহাই লাগে আপনি বিয়ের আগে আমার সঙ্গে আর দেখা কইরেন না। আর যদি দেখা হয়েও যায়, তবে বিয়ে নিয়ে কোনো কথা বলবেন না, প্লিজ। সব থেকে ভালো হয় আপনি আজ থেকেই বিয়ের ছুটি নিয়ে নিন। আর যদি আপনি ছুটি না নেন, তাহলে আমি আপনার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত ছুটি নিয়ে নেব। ভাই, আমারে মাফ করেন। আমি আর আপনার এই পেইন নিতে পারছি না।

: সরি ভাই।

ফরহাদ সাহেব করুণ মুখ করে আমার রুম থেকে চলে গেলেন। বেচারার করুণ মুখ দেখে কেন জানি মায়াই লাগল। মনে হলো সহজ–সরল এ মানুষটাকে এভাবে না বললেও পারতাম।

বি. দ্রষ্টব্য:

আমাদের এই জটিল পৃথিবীতে এখনো অনেক সহজ–সরল মানুষ আছে। যাদের আমরা বোকা মনে করি। তবে এ–জাতীয় মানুষকে আমার কাছে কেন জানি খুব কিউট মনে হয়। এরা আর যা–ই করুক অন্যের ক্ষতি করতে পারে না।

বি. দ্রষ্টব্যের বিশেষ দ্রষ্টব্য:

আপনারা কি ফরহাদ সাহেবের বাসররাতের ঘটনা জানতে চান? সে এক মজার কাহিনি। তবে আজ না অন্য কোনো দিন।